মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা

বাংলাদেশের ৪৮৪ টি উপজেলার একটি উপজেলা কুড়িগ্রাম সদর। এর আয়তন ২৭৮.৪৫ বঃ কিঃ এবং লোক সংখ্যা ২,৫৮,৪৪০জন। ৮ টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভা নিয়ে এই উপজেলা গঠিত। এই উপজেলার পূর্বে ভারতীয় সীমান্তের প্রান্ত ছুঁয়ে যাত্রাপুর ইউনিয়ন, পশ্চিমে রাজারহাট উপজেলা, উত্তরে নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী উপজেলা, দক্ষিনে উলিপুর উপজেলা। কুড়িগ্রাম শহর ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিন দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী ধরলা যা উলিপুর উপজেলার উপর দিয়ে চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদীতে মিশেছে। এ উপজেলার জনগণ সাহসী এবং প্রতিবাদী। তারা সংগ্রাম করেছে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে, তারপর পাকিস্তানি শাসন-শোষনের বিরুদ্ধে তারা ছিল সোচ্চার। বাঙ্গালীর স্বার্থের পরিপন্থী প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতিবাদ উঠেছে এই কুড়িগ্রাম থেকে।

মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলাবাসীর ভূমিকা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। দেশের ১১ টি সেক্টরের মধ্যে এই উপজেলা ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন। মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রামে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। সংগ্রাম পরিষদে যারা দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছিলেন তারা হলেন এ্যাডভোকেট আহমেদ হোসেন সরকার, মহুকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি, জনাব আহমদ আলী বকসী, অধ্যাপক হায়দার আলী, জনাব তছাদ্দক হোসেন ও জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ। ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ এর রংপুর উইং উপ-অধিনায়ক ছিলেন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ বাঙ্গালী ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন আহমেদ (জিয়াউর রহমান মৃত্যু মামলায় ফাঁসী দেয়া হয় তাকে)।

ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের ইপিআর উইং এর অধীনস্থ বেশ কয়েকটি সাপোর্ট প¬াটুন ছিল কুড়িগ্রামে। কুড়িগ্রাম সদর প¬াটুনের প¬াটুন কমান্ডার ছিলেন নায়েব সুবেদার নূর মোহাম্মদ। উর্দ্ধতন কর্মকর্তা হিসেবে নওয়াজেশ উদ্দিন পাঠালেন জরুরী নির্দেশ। প্রতিটি প¬াটুন বিওপিতে রয়েছে কিছু কিছ পাকিস্তানি সৈন্য। তাদের সবাইকে হত্যা করে সব বাঙ্গালী সৈনিককে নিয়ে কুড়িগ্রাম সদরে উপস্থিত হতে বলেন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ। অবিলম্বে তার নির্দেশ কার্যকরও হয়ে গেল। কুড়িগ্রাম শহরের ঘোষপাড়াস্থ সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহবায়ক আহমেদ আলী বকসীর গোডাউনে নিয়ন্ত্রন কেন্দ্রটি ছিল। নিয়ন্ত্রন কেন্দ্রটি ৩০শে মার্চ পর্যন্ত ছিল। কৌশলগত কারণে নিয়ন্ত্রন কেন্দ্রটি শহর থেকে বাহিরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ। পরে টগরাইহাট স্টেশনের অদূরে আহমেদ হোসেন সরকারের বাড়ীতে নিয়ন্ত্রন কেন্দ্রটি স্থানান্তর করা হয়। আর সেই সাথে স্থানান্তর করা হয় সমস্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ। এ্যাডভোকেট আহমেদ হোসেন সরকারের বাড়িটিই হয়ে গেল কুড়িগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় হেডকোয়ার্টার। তাইতো কুড়িগ্রাম ঋধষষ করার পর পাক হায়নাদের সমস্ত ক্ষোভ বর্ষিত হয় এ বাড়ির উপর। কামানের গোলা নিক্ষেপ করে এই বাড়িতে। তারপর আগুন দিয়ে ভষ্মিভূত করে ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন। ৪১ বছর পরও বাড়িটি ঠিক ভষ্মিভূত অবস্থায় রয়েছে।

জনাব আহমেদ হোসেন সরকার এ্যাডভোকেট মহুকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি। আওয়ামীলীগকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। অগ্নিঝরা দিনেও নিজের বাড়ীকে পরিণত করেন সামরিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র- মুক্তিযোদ্ধাদের কুড়িগ্রাম হেডকোয়ার্টার। তার বাড়ীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সেখানকার ছাত্র ও যুবকদের প্রশিক্ষিত করে যুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। আগ্নেয়াস্ত্রে গুলি ভর্তি করা, টার্গেট নির্ধারণ এবং গুলি ছোড়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়া হচ্ছিল। সেখান থেকেই পাকিস্তান হানাদার বাহীনির আগমন ঠেকাতে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ফলে এ বাড়ীর উপর পাকিস্তানিদের প্রচন্ড ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। আর তা ধ্বংস করতে গিয়ে পুরো টগরাইহাট গ্রামটি ধ্বংস করে দেয় হায়েনার দল। ধ্বংস হয় কুড়িগ্রাম হেড কোয়ার্টার। ২৫ শে মার্চের পর থেকেই কুড়িগ্রাম শহরকে পাক সেনা হানাদার মুক্ত রাখার নানা প্রয়াশ শুরু হয়। পুরো মহুকুমা জুড়ে চলছিল প্রস্তুতি। কিন্তু সবাই উপলব্ধি করছিলেন কুড়িগ্রামে পাকসেনাদের আগমন ঘটতে পারে রংপুর সেনানিবাস থেকে।

০৩ মার্চ থেকে সশস্ত্র প্রস্তুতি এবং প্রতিরোধের নের্তৃত্ব গ্রহণ করলেন নওয়াজেশ উদ্দিন। কার্যত তার নের্তৃত্বেই কুড়িগ্রাম জুড়ে মুক্তিযুদ্ধ বিস্তার লাভ করতে থাকে। কুড়িগ্রামে গঠিত হাই কমান্ড তখন তাৎক্ষনিক ভাবে কুড়িগ্রাম থানার সব পুলিশ সদস্যকে নিয়ে আসেন নিজ কমান্ডে। আনসার এবং মুজাহিদদেরও আনা হলো এ গ্র“পে। নানা স্থান থেকে এসে যোগ দিতে থাকে ইপিআররা। কিন্তু তাদের হাতে দিতে হবে অস্ত্র। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। তারা আবার আধুনিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত। সুতরাং এ রকম একটি আধুনিক মরনাস্ত্রে সজ্জিত অত্যাধুনিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তো লাঠি হাতে দাঁড়ানো যায় না। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় জনগণের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রগুলো নিয়ে আসা হয়। কেউ কেউ স্ব-ইচ্ছায় তুলে দিয়েছেন নিজের অস্ত্র। আবার কারো কারো অস্ত্র নিতে হয়েছে জোর করে। তার সাথে যোগ করা হলো থানার অস্ত্রগুলো। আনসারের অস্ত্রগুলো অনায়াসেই এলো দখলে। এভাবে সংগঠিত বাহিনীর আয়ত্তে আনা অস্ত্রগুলো তাৎক্ষনিক বিতরণ করা হয়। সাথে অল্প সল্প গোলাবারুদ যা আছে। যারা ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করেছেন তাদের সাথে সাথেই নিয়ে যাওয়া হয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেটাও অন্য কোথাও নয় ঐ শহরেই। মাঠে, রাস্তায়, যেখানে সুযোগ পাওয়া গেছে সেখানেই আগ্নেয়াস্ত্র থেকে বুলেট নিক্ষেপটা তালিম দিয়ে হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে অন্ততঃ একটি রাইফেল। সবাইকে নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করা হয়েছে সম্ভাব্য আক্রমন প্রতিহত করা জন্য। অবশেষে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন আহমেদ এসে এ বাহিনীরই নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরা সবাই কুড়িগ্রামের  প্রথম প্রতিরোধ তিস্তা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।

হালকা হলেও অস্ত্র এবং গোলাবারুদ সংগ্রহিত হয়েছিল কুড়িগ্রাম মহুকুমার বিরাট এলাকাজুড়ে সীমান্তের চেকপোষ্ট বা বিওপি থেকে। কুড়িগ্রাম, চীলমারী, ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ীসহ নানাস্থানে ইপিআর ক্যাম্পগুলো থেকেও এসেছে অস্ত্র। বিভিন্ন বাহিনী থেকে স্বাধীনতার প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বেরিয়ে আসা বাঙ্গালী জোয়ানরাও বেশ কিছু অস্ত্র নিয়ে বের হয়ে এসেছিল। এসব অস্ত্র দিয়েই প্রাথমিক প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়।

২৫ শে মার্চের পর থেকেই কুড়িগ্রাম শহরে পাক সেনা হানাদার মুক্ত রাখার নানা প্রয়াশ শুরু হয়। রংপুর থেকে পাকিস্তান সৈন্যরা কুড়িগ্রামে আসবেই, এরকম ধারনাটা ধীরে ধীরে বাস্তব হওয়ার আলামত স্পষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের দেশ প্রেমিক জোয়ানরাও সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সেই যে, বঙ্গবন্ধুর বজ্র কঠোর আহবান, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে। সেভাবে যার হাতে যা উঠেছে তা নিয়ে ছুটেছেন তিস্তা অভিমুখে। কুড়িগ্রাম থেকে রংপুরের দুরত্ব ৫০ কিঃমিঃ। সেখান থেকে পাক বাহিনীর এক বিরাট গ্র“প প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে রওনা করে কুড়িগ্রামের দিকে। ২১ কিঃমিঃ পূর্বে তিস্তা সেতু। সেখান থেকে আরও ২৯ কিঃমিঃ পূর্বে কুড়িগ্রাম। প্রতিরোধ সৃষ্টি হলো তিস্তা নদীর পূর্বতীরে। মুক্তি বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ। শুরু হলো সম্মুখ যুদ্ধ। পশ্চিম তীরে পাকিস্তান সৈন্যদের বিরাট বাহিনী। হাতে তাদের ভারী অস্ত্র ও অফুরন্ত গোলাবারুদ। অন্য দিকে পূর্ব পাড়ে ৩০৩ রাইফেল হাতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ অল্প সংখ্যক আর্মি, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার। সাথে ছাত্র-যুবক, শ্রমিক ও কৃষকসহ বাংলার আপামর জনতা। শুরু হলো যুদ্ধ।

কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষ এতটাই উত্তেজিত, দেশপ্রেমে উদ্বেলিত ছিল যে, খালি হাতে তারাও চলে যায় তিস্তা। অবশ্য তারাও এক একটি ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়েছে। কেউ গুলির বাক্সটি এগিয়ে নিয়ে গেছেন সামনের দিকে। কেউবা খাদ্য ও পানি নিয়ে গেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। উৎসাহ দিতে যোদ্ধাদের শক্তি ও সাহস যোগাতে যে যা পারে তাই করে গেছে। এভাবে চলছিল তিস্তা যুদ্ধ, যুদ্ধ চলছে নদীর এপার- ওপারে। দিনে দিনে নিঃশেষ হচ্ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ। অভুক্ত থেকে দূর্বল হয়েছে পড়েছে অনেকে। কমে যাচ্ছে অস্ত্রের কার্যকারিতা। এভাবে খুব বেশিদিন পাকিস্তানিদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না, সংগঠক ও রাজনীতিকরা এ উপলব্ধি করতে পরেছেন।

৫ এপ্রিল সকাল বেলা কুড়িগ্রাম চিল্ডেনপার্কে আহবান করা হয় একটি জনসভা। নতুন পরিস্থিতিতে জনতার করনীয় কি হবে তা জানতে আগ্রহী জনতার ভিড় জমে ওঠে। তছাড়া মাত্র ২৯ কিঃমিঃ দূরত্বে চলছে যুদ্ধ, ক্ষনে ক্ষনে কামানের গর্জন। কেঁপে উঠেছে শহর। এ অবস্থায় অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তারা শহর ছেড়ে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে আহবান জানান। একইভাবে হেডকোয়ার্টার পুনঃ স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তায় টগরাইহাট থেকে তা সরিয়ে নেন ধরলা নদীর ওপারে নাগেশ্বরী থানায়। ৫ই এপ্রিল দুপুর থেকেই কুড়িগ্রামবাসীরা শহর ছাড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে জনশূণ্য হয়ে পড়ে কুড়িগ্রাম। এ সময়ে তিস্তা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। ৭ই এপ্রিল প্রতিরোধ প্রত্যাহার করে কুড়িগ্রাম শহরে একটি ছোটখাটো প্রতিরোধ সৃষ্টির প্রয়াস চালায়।

মুক্তিযোদ্ধারা তিস্তা ছেড়ে চলে এলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অতিক্রম করে তিস্তা ব্রিজ। রংপুর থেকে এসে যোগ দেয় আরও পাক সেনা। ট্রেন থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ করাতে করাতে অগ্রসর হয় তারা কুড়িগ্রামের দিকে। আশেপাশের অনেকে গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে আসার পথে। রাস্তায়, গ্রামে এবং মাঠে, বাজারে যেখান থেকে পেয়েছে তারই বুকে বিদ্ধ করেছে এক একটি বুলেট। এভাবে কত শত লোক হত্যা করেছে তারা এর কোন পরিসংখ্যান আজও পাওয়া যায় নি। বিকালের দিকে পৌঁছায় কুড়িগ্রামের উপকন্ঠে। সেখানেও ছিল প্রতিরোধ, কিন্তু সেটাও দূর্বল। অসংগঠিত অপ্রতুল অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে এ প্রতিরোধ বেশীক্ষন টিকে থাকতে পারেনি। একদিকে মুক্তিযোদ্ধারা রওনা করে নাগেশ্বরীর দিকে অপরদিকে কুড়িগ্রাম শহর চলে যায় হানাদার পাকবাহিনীর দখলে।

সাতদিন ধরে তিস্তায় পাকিস্তানি বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন আফজাল হোসেন। মাতৃভূমির  স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে করতে তিনিই প্রথম শহীদ হয়েছেন কুড়িগ্রামে।

একাত্তরের ৭ এপ্রিল। পাকবাহিনী ট্রেন যোগে অগ্রসর হয়েছে কুড়িগ্রাম শহরের দিকে। নতুন শহরের খলিলগঞ্জে  তখন কিছু মুক্তিযোদ্ধা সংগঠিত হয়। তাদের অবস্থান ছিল বর্তমান রেল স্টেশনের কাছে খলিলগঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজ। সেখানে থেকে একটি প্রতিরোধ গড়ার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল যা ব্যর্থ হয়েছে।

শহরে প্রবেশ করে হায়নার দল। এদিক ওদিক গণহত্যা চালাতে চালাতে উপস্থিত হয় সার্কিট হাউসে। গুলি ছুড়ছে যখন যেদিকে ইচ্ছে। এরই মধ্যে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো তাদের কুড়িগ্রাম কারাগারের প্রতি। বাঙালী হয়েও তখন পর্যন্ত ডিউটি করছে বাঙালী পুলিশরা। জেল পুলিশের ইনচার্জ এবং অন্য পাঁচজন পুলিশের একটি দল পুরো কারাগারের দায়িত্বে নিয়োজিত। পাকিস্তানিরা তাদেরকে বিশ্বাস করতে পারেনি। কারন বাঙালী মানেই তাদের শত্র“। তাদেরকে সারিবদ্ধ করে বর্তমান সার্কিট হাউজের মোড়ে (চৌরাস্তা) অর্জুন আর কৃষ্ণচুড়া বৃক্ষের নিচে ব্রাশফায়ারে নির্মম ভাবে তাদের হত্যা করা হলো। তাৎক্ষনিক প্রাণ দিলেন লাল মোহাম্মদ, আনসার আলী, সাজ্জাদ আলী ও জহির উদ্দিন। জেল ইনচার্জ শেখ হেদায়ত উল¬াহ্ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর সাথে লড়তে লড়তে রাত ১১ টার দিকে প্রাণ ত্যাগ করেন।

কুড়িগ্রাম শহর এবং আশপাশে আরো অনেক হত্যাকান্ড সংঘটিত করে পাকিস্তানিরা। ঐদিন তারা কুড়িগ্রামে অবস্থান করেনি। চলে যায় আবার ট্রেন যোগে তিস্তার দিকে।

দ্বিতীয়বার হায়েনাদের আগমন তারিখটা ছিল এপ্রিলের ১৪ তারিখ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আবার আসবে কুড়িগ্রামে। দখলে নিতে চায় শহর। সেজন্য তারা গ্র“প গঠন করে রংপুর  সেনানিবাসে। কুড়িগ্রাম শহরে আবার হায়েনার দল আসছে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র, ততক্ষনে সংগঠিত হয় মুক্তিসেনারা এবং অবস্থান নেয় রেল সড়কের কাছাকাছি স্থানে। আসতে থাকে দীর্ঘ ট্রেন যার ভিতরে মানুষরুপী হায়নাগুলো, আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি। ঐদিন কুড়িগ্রামের প্রবেশ মুখে মুক্তিযোদ্ধারা গড়ে তোলে তুমুল প্রতিরোধ। এক সময় প্রতিরোধ ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে তারা কুড়িগ্রামে।

সেদিন গুলিবিদ্ধ হয় যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা হলেন নতুন রেল স্টেশনের সন্নিকটে বেলগাছা ইউনিয়নের কালে মৌজার ডাঃ সফর উদ্দিন  আহমদ, যিনি পেশায় একজন ডক্তার।  অন্যদিকে তিনি ছিলেন একজন সমাজ সেবক, শিক্ষানুরাগী ও জন প্রতিনিধি। অন্যরা হলেন আলহাজ্ব সজর উদ্দিন আহমদ, আব্দুল লতিফ, পোয়াতু মামুদ, বরিজ উদ্দিন, শাহাব উদ্দিন ও ভোলানাথ। অবশেষে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কুড়িগ্রাম শহর এবং তিস্তা- কুড়িগ্রাম রেলপথের দু’ধারের বাড়িঘর পুড়িয়ে ছাইভষ্মে পরিণত করে দেয় এবং চালায় ব্যাপক ধ্বংসযঞ্জ। সে সময়ই পুড়িয়েছিল আওয়ামীলীগ নেতা এ্যাডভোকেট আহমদ হোসেন সরকারের  বসতবাড়ি। সেখানে ছিল মুক্তিযুদ্ধের হেড কোয়ার্টার।

কুড়িগ্রাম শহর পুনঃরায় পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রনে চলে যায় ২০ এপ্রিল। মুক্তিযোদ্ধারা ধরলা নদী অতিক্রম করে অন্য তীরে অবস্থান নেয়। কিন্তু পকিস্তানিরাও নদী অতিক্রম করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যাতে করে নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী আসবে তাদের নিয়ন্ত্রনে এবং তারা পৌঁছাতে পাড়বে সোনাহাট সীমান্ত পর্যন্ত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি করতে হবে সর্বাত্মকভাবে। ভূরুঙ্গামারী থানার সীমান্তবর্তী স্থান সোনাহাটে ততদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন কেন্দ্র। ইতোমধ্যেই যোগ দিয়েছিল সেখানে অসংখ্য ছাত্র যুবক।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধরলা অতিক্রম করতে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে। ততদিনে অন্য তীরে অবস্থানরত মুক্তিসেনারাও গোলাবারুদের অভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে। তাই ২৬ মে কোন এক সময় ধরলা নদী অতিক্রম করতে সক্ষম হয় পাক সেনারা। তার পর অগ্রসর হতে থাকে নাগেশ্বরীÑভূরুঙ্গামারী অভিমুখে।

৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে অসংখ্য কোম্পানী ছিল এবং প্রতিটি কোম্পানী একজন কোম্পানী কমান্ডারের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। কুড়িগ্রামে এরুপ দুটি কোম্পানীর নেতৃত্বে ছিলেন কোম্পানী কমান্ডার কে,এম আকরাম হোসেন এবং আব্দুল হাই সরকার, বীর প্রতীক। কোম্পানী কমান্ডার কে, এম আকরাম এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকা ছিল উলিপুর-কুড়িগ্রাম- রাজারহাট- তিস্তা পর্যন্ত। তার কোম্পানীর অবস্থান ছিল নাজিমখায় যার তিনদিকে পাক সেনাা কর্তৃক বেষ্টিত। অপর কোম্পানী কমান্ডার আব্দুল হাই সরকার, বীর প্রতীক যিনি তার কোম্পানী নিয়ে মোগলবাসা নামক স্থানে কয়েকটি ক্যাম্প ও আস্তানায় থেকে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। প্রায়শই তারা পাকসেনাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আতর্কিতে হামলা করে তাদের ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে নিজ ক্যাম্পে / আস্তানায় ফিরে আসতো। এই কোম্পানী দুইটির অন্যতম আরেকটি কাজ ছিল তিস্তা - রাজারহাট-টগরাইহাট-কুড়িগ্রাম-হালাবট-দুর্গাপুর-উলিপুর পর্যন্ত রেল লাইনে এ্যান্টি ট্যাংক মাইন বসিয়ে পাক সেনাদের চলমান ট্রেন উড়িয়ে দেয়া। যুদ্ধকালীন সময় যে কয়েকটি ট্রেন উড়িয়ে দেওয়া ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ সফল। এতে পাকসেনাদের হতাহতের সংখ্যা ছিল প্রচুর।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসর এবং সব অপকর্মের সহযোগী শান্তি কমিটি। কুড়িগ্রামেও শান্তি কমিটির শাখা গঠিত হয়। আর তা গঠন করেছিল জামায়াতে ইসলামী ও মুসলীম লীগের নেতারা । কুড়িগ্রাম সবুজপাড়ায় অতুল চৌধুরীর বাড়িটি দখল করে সেখানেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল শান্তি কমিটির প্রধান কার্যালয়। ইসলাম রক্ষার নাম করে তারা সেখানে সব কু-কর্মের পরিকল্পনা করতো। রাজাকার বাহিনী পাঠিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনকে ধরে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়া হতো ঐ বাড়িটি থেকে। আর তাদের শাস্তি দেয়ার ঘোষনাও আসতো এখান থেকেই। অর্থাৎ অতুল চৌধুরীর বাড়িটি যাবতীয় আকাম- ক-ুকামের কেন্দ্র বিন্দু। অতঃপর মুক্তিযোদ্ধাদের এক অপারেশনে পাক দালালদের উক্ত কার্যালয়ে অবস্থানরত দুজন কুলাঙ্গার মারা যায়। একই সাথে আহত হয় কুড়িগ্রাম শান্তি কামিটির চেয়ারম্যান মাওলানা শামসুল হক (বাড়ি ভিতরবন্দ, নাগেশ্বরী)। নভেম্বর মাস থেকে সারাদেশে মুক্তিবাহিনীর অগ্রাভিযান শুরু হয়। প্রতিটি রনাঙ্গঁনে তীব্র আক্রমন রচনা করে পর্যুদস্ত করতে থাকে পাক সেনাদের।

১ ডিসেম্বর থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা পৌঁছে যার শহরের উপকন্ঠে ধরলা তীরে। একটি একটি গ্র“প করে বিশাল ধরলা অতিক্রম করে অবস্থান নেয় শহরের ভেতর নানা স্থানে। মুক্তিযোদ্ধাদের চাপ তখন প্রচন্ড, যা প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছিল না পাকিস্তানিদের পক্ষে। ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা শুরু হয় কুড়িগ্রামে। ইতোমধ্যে অন্যান্য স্থানে যে পাকিস্তানি ঘাঁটি ছিল সেগুলো গুটিয়ে পাকিস্তানিরা চলে এসেছে কুড়িগ্রাম শহরে। মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা তখনও অব্যাহত। পাকিস্তানি সৈন্যরা পাল্টা আক্রমনের সাহসও হরিয়ে ফেলে। তারা শহরের সব ক্যাম্প ছেড়ে জড়ো হয় রেলস্টেশনের কাছে।

৬ ডিসেম্বর আব্দুল হাই সরকার, বীর প্রতীক এর নেতৃত্বে ৩৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রবেশ করে শহরে। তারপর পাকিস্তানিদের হারিয়ে দিয়ে উড়ানো হয় সবুজ জমিনের উপর লাল সূর্য খচিত বাংলার পতাকা। তারপর মুক্তিযোদ্ধরা অসম সাহস নিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে ঢুকে পড়ে অবস্থান নেয় যথাক্রমে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, ভকেশনাল ইন্সটিটিউট, সরকারি বালক বিদ্যালয়, পিটিআইসহ বিভিন্ন স্থানে।

বিকাল ৩টায় পাকিস্তানি সব সৈন্য উঠে পড়ে একটি ট্রেনে। তারপর জানালা দিয়ে দুপাশে গুলি ছুড়তে ছুড়তে ট্রেন নিয়ে চলে যায় রংপুর অভিমুখে। কুড়িগ্রাম শহর  হানাদার মুক্ত। চিরদিনের মতো স্বাধীন হলো কুড়িগ্রাম। শহরের পানির ট্যাঙ্কির চূড়ায় বিকাল ৪টায় আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হয় বাংলাদেশের পাতাকা। যে পতাকা পতপত করে উড়বে অনন্তকাল ধরে প্রতিবছর ৬ ডিসেম্বর পালিত হয়ে আসছে কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত দিবস হিসেবে। সদর উপজেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১৮ জন। এ উপজেলা খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ জন। সর্বমোট মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৫৮০ জন। মুক্তিযোদ্ধের অসংখ্যা স্মৃতিবাহী কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা। স্বাধীনতার পর স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখার নানা প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকার, পৌরসভা, এনজিও এবং এমনকি ব্যক্তিগত/ পারিবারিক  উদ্যোগে স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। তন্মধ্যে শহীদ ঘোষপাড়া স্মৃতিসৌধ, শহদী স্মৃতি ফলক, স্বাধীনতার বিজয় স্তম্ভ ইত্যাদি।

সংকলনেঃ জনাব মোঃ আব্দুল বাতেন
           উপজেলা কমান্ডার
     বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ
  কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কমান্ড।

 

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাগণের তালিকাঃ

 

১।       শহীদ আঃ জলিল

          পিতাঃ মৃত: বকিয়ত উল্যা

          গ্রামঃ টেনারী পাড়া

          পোষ্টঃ কুড়িগ্রাম।

 

২।       শহীদ গোলাম রববানী

          পিতাঃ মৃত: চয়েন উদ্দিন

          গ্রামঃ টেনারী পাড়া

          পোষ্টঃ কুড়িগ্রাম সদর।

 

৩।      শহীদ মোস্তাফিজার রহমান (মধু)

          পিতাঃ মৃত: মজাহার আলী

          গ্রামঃ পুরাতন স্টেশন পাড়া

          পোষ্টঃ কুড়িগ্রাম সদর।

 

৪।       শহীদ আব্দুল হামিদ ফকির

          পিতাঃ মৃত: রিয়াজ উদ্দিন ফকির

          গ্রামঃ সবুজ পাড়া

          পোষ্টঃ কুড়িগ্রাম সদর।

 

৫।       শহীদ আজিজুল হক

          পিতাঃ মৃত: ধজির মামুদ মুন্সি

          গ্রামঃ শিবরাম

          পোষ্টঃ কাঁঠালবাড়ী।

 

৬।      শহীদ আব্দুল কবির

          পিতাঃ মৃত: নৈমুদ্দিন

          গ্রামঃ মালভাঙ্গা

          পোষ্টঃ মোগলবাসা।

 

৭।       শহীদ আফজাল হোসেন

          পিতাঃ মৃত: কাচু শেখ

          গ্রামঃ ভোগডাঙ্গা

          পোষ্টঃ ভোগডাঙ্গা।

 

৮।      শহীদ দেলোয়ার হোসেন

          পিতাঃ মৃত: ধনী মামুদ

          গ্রামঃ ভোগডাঙ্গা

          পোষ্টঃ ভোগডাঙ্গা।

 

৯।      শহীদ মনির উদ্দিন

          পিতাঃ মৃত: জহির উদ্দিন

          গ্রামঃ নিধিরাম

          পোষ্টঃ মোগলবাসা।

 

১০।     শহীদ আফছার আলী

          পিতাঃ মৃত: নছিয়তুল্যা ব্যাপারী

          গ্রামঃ ঘনেশ্যামপুর

          পোষ্টঃ যাত্রাপুর

 

১১।     শহীদ আঃ কাশেম

          পিতাঃ মৃত: হোসেন আলী

          গ্রামঃ ভোগডাঙ্গা

          পোষ্টঃ ভোগডাঙ্গা ।

 

১২।     শহীদ খয়বর আলী

          পিতাঃ মৃত: তছির শেখ

          গ্রামঃ কাচিচর

          পোষ্টঃ ভোগডাঙ্গা।

 

১৩।     শহীদ খয়বর আলী

          পিতাঃ মৃত: ফজলার রহমান

          গ্রামঃ মধ্যকুমরপুর

          পোষ্টঃ ভোগডাঙ্গা।

 

১৪।     শহীদ মনির উদ্দিন

          পিতাঃ মৃত: মাদার বক্স

          গ্রামঃ বাঞ্চারাম

          পোষ্টঃ মোগলবাসা।

 

১৫।     শহীদ জামাল উদ্দিন

          পিতাঃ মৃত: মাফুজার রহমান

          গ্রামঃ আধগ্রাম

          পোষ্টঃ কাঁঠালবাড়ী।

 

১৬।     শহীদ নুর ইসলাম

          পিতাঃ মৃত: ইব্রাহীম ব্যাপারী

          গ্রামঃ নিধিরাম

          পোষ্টঃ মোগলবাসা।

 

১৭।     শহীদ খয়বার আলী

          পিতাঃ শহর উদ্দিন

          গ্রামঃ মোল্লাপাড়া

          পোষ্টঃ কুড়িগ্রাম সদর।

 

১৮।    সিপাহী শহীদ আঃ কাদের

          পিতাঃ মৃত: ইউসুফ আলী

          গ্রামঃ কৃষ্ণপুর

          পোষ্টঃ মোগলবাসা